মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ ১১:০২:৩৯ এএম

যশোর রোড কি শুধু ঐতিহ্য না ভবিষ্যতও?

আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি | খোলা কলাম | বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮ | ০৫:২৮:৩৮ পিএম

ছোট একটা ঘটনাবলি। বরিশাল বিএম কলেজে ২০১০ সালের ঘটনা। শহরের উন্নয়ন হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ড্রেন বড় করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের কারণে বিএম কলেজের সীমানা প্রাচীর সংলগ্নদুর্লভ প্রজাতির‘নাগলিঙ্গম’গাছটি ক্ষতিগ্রস্থ হতে বসে। যতদূর জানা যায় বাংলাদেশে এই গাছ আছে হাতে গোনা কয়েকটি। তার ভেতর বিএম কলেজে একটি গাছ শোভা ছড়াচ্ছে এখনো।

এটি যে একটি দুর্লভ গাছএবং এর মূল শেকড় কাটা পরলে যে মৃত্যুর মুখে পরবে সে বিষয়ে সংশ্লিস্ট কারো মাথা ব্যাথা নেই। একদিন খুব ভোরে যখন শিক্ষার্থীরা খবর পায়, যে প্রক্রিয়ায় কাজ চলছে তাতে গাছটি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

এই ঘটনা জেনে সাথে সাথেই কিছু শিক্ষার্থী ঘটনা স্থলে পৌঁছে তৈরি করে ‘মানব বর্ম’।

হাতে হাত বেঁধে পুরো গাছটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে যায় তারা। শিক্ষার্থীদের বাধায়
কাজ বন্ধ হয়ে গেলে প্রভাবশালী মহলের হুমকি ধামকি আসে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সেদিন সরে যায়নি। তাদের অনঢ় অবস্থানের কারণেই ড্রেনেজ পরিকল্পনা বদলে কিছুটা ঘুরিয়ে কাজ করা হয়। ফলে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে তখন রক্ষা পায় দুর্লভ ‘নাগলিঙ্গম’ গাছটি। গাছটি দুর্লভ প্রজাতির হওয়ায় গণমাধ্যমেও সেদিন সাড়া পরে ওই খবরটি।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ ও এইসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা। তারা কি শিক্ষা নিলো সে ঘটনা জানানোর আগে আমরা আরো কয়েক দশক পেছনে ফিরে আরেকটি ঘটনাকে দেখতে চাই। ঘটনাটি ভারতের উত্তর খন্ডের । ১৯৭৩ সালে গাড়োয়াল হিমালয়ে সেখানকার বাসিন্দারা একটি আন্দোলন করে।

নাম চিপকো আন্দোলন। চিপকো শব্দের অর্থ জড়িয়ে ধরা বা চেপে ধরা। সবুজ এই ভূমিতে সেখানকার বন বিভাগের নির্দেশে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয়।

তখন বনের গাছগুলো রক্ষার দাবি জানিয়েও কোন লাভ হয়নি এবং যথারীতি গাছ কাটতে চলে আসে উন্নয়নের ‘করাত বাহিনী’।

তখন স্থানীয় নারী, পুরুষ, শিশুরা এসে জড়িয়ে ধরে গাছগুলোকে। বিশেষ করে নারীরাই এখানে শক্ত অবস্থান নেয়। ফলে গাছ কাটা থেকে সরেআসতে বাধ্য হয় তারা। এই ঘটনা পরবর্তীতে পরিবেশ সচতেন জনগণের ভেতর ব্যাপক সাড়া ফেলে।

এবার
আমরা আবার ফিরে আসি বিএম কলেজে। বলেছিলাম নাগলিঙ্গম গাছ রক্ষা আন্দোলনের
মধ্য দিয়ে তথাকথিত উন্নয়নকারীরা একটি ‘শিক্ষা’ গ্রহণ করেছিলো। সেই শিক্ষাটি
ছিলো যে ক্যাম্পাসের সচেতন শিক্ষার্থীরা তাদের এই প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ
বিধ্বংসী উন্নয়নের বিপরীতে কথা বলে। তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা এবার
কৌশল অবলম্বন করে পরবর্তী পদক্ষেপে। সেই কৌশলটি ছিলো ক্যাম্পাস ছুটির সময়ে
শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বেশ কিছু গাছ কেটে সীমানা প্রাচীর
নির্মাণ করে। এই সীমানা প্রাচীর গাছগুলোকে রক্ষা করেও করা যেতো কিন্ত তা
তারা করেনি। তারা যা করেছে তা হলো সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের যোগসাজশে গাছগুলো
কেটে ব্যক্তিগত পকেট ভারী করা। 

একটা ছোট ক্যাম্পাসের ছোট একটি নমুনা
দিলাম মাত্র এই উন্নয়ন তরিকাধারীদের নিয়ে। আর বড় নমুনাতো পুরো বাংলাদেশ!
দেশ ব্যাপী উন্নয়নের নামে আজ একের পর এক পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প হাজির করা
হচ্ছে আমাদের সামনে। তাই যশোর রোড থেকে সুন্দরবন একই গাল গল্প আমরা দেখতে
পাচ্ছি উন্নয়নের নামে। যশোর রোডের শতবর্ষী গাছগুলো রক্ষার জন্য আজ প্রতিবাদ
শুরু হয়েছে দেশব্যপী। বিভিন্ন মহল থেকে সচেতন মানুষরা আজ কথা বলছে। যশোর
রোডের গাছগুলো রক্ষা করতে উঠে আসছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও। এই
যশোর রোডের গাছের ছায়ায়ই তো সেদিন লাখ লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলো। 

চিপকো আন্দোলনে গাছ জড়িয়ে ধরে প্রতিবাদ। ছবি : সংগৃহীত

মার্কিন
কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা অবলম্বনে মৌসুমী ভৌমিক গেয়েছেন ‘শত শত
মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত বলে’। সেই যশোর রোড কিংবা এই যশোর রোড শুধু
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির কথাই বলছে না। সেই সাথে বলছে শঙ্কার
কথাও। সারি সারি শতবর্ষী গাছের ছায়ায় ঢাকা যশোর রোড এখন মানুষের মুখে
মুখে শঙ্কার নাম হয়ে উচ্চারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গেও পৌঁছে
গেছে এই শঙ্কা। এই শঙ্কার শুরু কিন্তু অনেক আগেই নিরবে ঘটে গেছে। উন্নয়নের
নামে যখন কৃষি জমিকে পরিত্যাক্ত দেখিয়ে স্পেশাল ইকনোমিক জোন করা হয় তখনই
কিন্তু এই শঙ্কা শুরু হয়েছে। উন্নয়নের নামে যখন বন উজাড় করা হয় তখনই এই
শঙ্কা শুরু হয়েছে। আধুনিক শহরের নামে যখন সাড়ি সাড়ি গাছ চলে যায় করাত কলের
ভেতর তখনই কিন্তু এই সব শঙ্কা এগিয়ে আসে আমাদের অস্থিমজ্জা পাজরের কাছে।
যার আরেকটি নমুনা এই যশোর রোড।

যশোর রোডের গাছ গুলো রক্ষায় যে
প্রতিবাদ শুরু হয়েছে তার সাথে শুধু মুক্তিযুদ্ধ বা ঐতিহ্যই নয় সাথে সাথে
উপলব্ধিতে রাখতে হবে এই সব বৃক্ষ কিন্তু আমাদের প্রাণ প্রকৃতি জীবনের
আধারও। শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কিংবা ইতিহাসের জায়গা থেকেই নয় আমাদের
ভবিষ্যতও জড়িয়ে আছে এর সাথে। এই উপলব্ধি এই বার্তা যদি এখনই আমরা
রাষ্টের কানে পৌঁছাতে না পারি তাহলে হয়তো আমাদের অগোচরেই কিংবা প্রতিবাদ
শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন প্রাণ বিধ্বংসী প্রকল্পের
মাধ্যমে উৎসবের আমেজে ধ্বংস করা হবে। অতীতের এমন অনেক ভুল পদক্ষেপের
কারণে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে এখন পরিবেশগত জায়গা থেকে বিপর্যয়ের দিকে
যাত্রা শুরু করেছি। এই বিপর্যয় কি আমরা থামিয়ে দিবো না কি তাকে চলতে দিবো
তার উপর নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশ। আগামী ৩০/৪০ বছর পর বাংলাদেশের চিত্র
কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নির্ধারন হচ্ছে বর্তমান কার্যক্রমের উপর। আমরা যদি
এখনই রাষ্ট্রকে বোঝাতে না পারি যে প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে সুস্থ জীবনের উন্নয়ন
প্রাণ প্রকৃতি মানুষের সম্মিলিত বেঁচে থাকার উন্নয়ন তাহলে সামনে ভয়ঙ্কর
বিপদ।

‘পাখিরা বসতে পারে এমন কোন বৃক্ষ নেই
জোনাকি লুকাতে পারে এমন কোন গুল্ম নেই
সূর্য শীতল হবে এমন কোনো নদী নেই’

কবি
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এই কবিতাটিই কি হবে ভবিষ্যত বাংলাদেশের ছবি?
বসন্তহীন হয়ে পড়ার আগে রাষ্ট্রকে তা উপলব্ধি করতে হবে না হলে উপলব্ধি করাতে
হবে।

লেখক: নির্মাতা, এক্টিভিস্ট ও  সাংবাদিক



খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন