বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯ ১০:৪১:৫৬ এএম

ঐতিহ্যগুলো যেন এক রূপকথা!

মো: সাজ্জাদ হোসেন | উপসম্পাদক | বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | ০৬:১২:৪৩ পিএম

সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা যান্ত্রিক হয়ে গেছি। এই যান্ত্রিকতার কারণে হারাতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা জিনিস। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লাঙল, ঢেঁকি, পালকি, চরকা, যাঁতা আরও অনেক কিছু।
মানুষের মূল লক্ষ্য হলো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় পেছনে ফেলে আসতে হয়েছে পুরনো এই জিনিসগুলো।
একসময় এসবই আমাদের অগ্রগতিকে তরান্বিত করেছে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে মানুষ কাজকে আরও নির্ভুল করতে ধীরে ধীরে যন্ত্রনির্ভর হয়ে গেছে। 
এছাড়া প্রতিযোগীতার এই যুগে তাল মেলাতে কম সময়ে সহজ উপায়ে বেশি ও টেকসই ফল লাভ করতে যন্ত্রনির্ভর না হয়ে উপায় নেই। 
যারা শহরে বড় হয়েছে তারা এমনকি গ্রামের অনেক শিশুই জানে না যাঁতা, ঢেঁকি, পালকি বা চরকা কী আর কিইবা তাদের ব্যবহার। 
আমরা গ্রামে যারা বড় হয়েছি তারা অনেকেই লাঙল চিনি। তবে খুব ভোরে লাঙল-জোয়াল কাঁধে কৃষকের মাঠে যাবার সেই দৃশ্য আজ আর দেখা যায় না। তার বদলে এখন দেখা যায় যন্ত্রচালিত লাঙল। ভোর না হতেই কৃষকের লাঙল নিয়ে মাঠে যাওয়ার দৃশ্য কদিন পর কল্পনাতেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ পরের প্রজন্ম কখনও আর জানবেই না লাঙল জোয়ালের কথা। 
ঢেঁকি হয়তো অনেকেই চেনে। এক সময় আমাদের গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঢেঁকি ছিল। গ্রামের মানুষেরা ধান সিদ্ধ করে শুকিয়ে ঢেঁকিতে ভেনে চাল তৈরি করতো। আবার পিঠা তৈরির সময় চালের আটা তৈরিতেও ঢেঁকির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এখন গ্রামে গ্রামে রয়েছে ধান, চাল ভাঙানোর মেশিন। 
ঢেঁকির প্রচলন একেবারেই নেই এখন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে খুঁজলে হয়ত দুই একটি ঢেঁকি পাওয়া যেতে পারে। অথচ আগে গাঁয়ের সব বাড়িতেই ঢেঁকি থাকতো। প্রতি বাড়িতে ঢেঁকিঘর বলে একটি আলাদা ঘর থাকত। সেখানেই ঢেঁকি থাকত, ধান ভানা হতো। কুলায় ঝেড়ে কুড়া-চাল আলাদা করা হতো। সে ছিল এক মহাযজ্ঞ। আজ কোথায় হারিয়ে গেছে সেই দিনগুলো। আজকাল গ্রামে গেলে আর ঢেঁকিতে ধানা ভানার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়না। কৃষাণির মহাযজ্ঞের এই কাজটা চলে গেছে ধানভাঙা কলের কাছে। 
বৌ বাপের বাড়িতে নায়র যাবে কিংবা বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে আসবে, একমাত্র বাহন পালকি। এই পালকির আবার বিভিন্ন রকমফের ছিল। কোনটা ছিল অতি সাধারণ।বাঁশের পাটাতন, দুইপাশে বাঁশের চাটায়ের বেড়া আর এর মাঝখানে একটু কেটে দরজাওয়ালা পালকিকে আমাদের এলাকায় মানে বরগুনায় মাফা বলা হয়।
মাফায় চলাচল পালকির চেয়ে সস্তা ছিল বলে অতি সাধারণ ঘরের বউরা এগুলোতে চলাচল করতো। আর কাঠের তৈরি দরজা লাগানো পালকিতে চড়তেন অবস্থাসম্পন্ন ঘরের মেয়ে বৌ। এসব পালকির কোনো কোনোটা আবার বাইরের দিকে কারুকাজ করা থাকতো।
বড়দের কাছে গল্প শুনেছি আমাদের গাঁয়ে এক ধরনের পরিবার ছিল তারা পালকি, মাফা ভাড়া দিতো। তাদের সানাই বলা হতো। তারা নিজেরাই সেগুলো ভাড়ায় বহন করত।অনেক বাড়িতে আবার বাহারি পালকি থাকত। দরকারের সময় সানাইদের ডেকে আনা হতো।কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে হারিয়ে গেছে আমাদের সেই গ্রামীণ ঐতিহ্য।এখন গ্রামেও সিএনজি চালিত অটো রিকশা, টেম্পু আরও কত যানবাহন চলাচল করছে। বৌয়ের পালকি চড়ে বাপের বাড়ি যাবার দৃশ্য আজ শুধুই যেন রুপকথা।
মো: সাজ্জাদ হোসেনউপ-সম্পাদক, ইউরোবিডিনিউজ.কম

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন