বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯ ১১:২৫:৩২ এএম

দিনাজপুরে চোর সন্দেহে পুলিশকে পেটানোর ঘটনায় থানায় মামলা, ৩টি গ্রাম পুরুষশূন্য

জেলার খবর | দিনাজপুর | বুধবার, ১ নভেম্বর ২০১৭ | ১১:৫৫:৩৩ এএম

চোর সন্দেহে পুলিশকে পেটানোর ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে ৩টি গ্রাম।

ওই তিনটি গ্রামের এক হাজারেরও বেশী পরিবারের নারী ও শিশুরা এখন চরম আতংকে রয়েছে। দিনাতিপাত করছে নিরাপত্তাহীনতায়। ওই তিন গ্রামে এখন বন্ধ রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কৃষিকাজসহ যাবতীয় কর্মকান্ড। শিক্ষার্থীরাও আতঙ্কে যেতে পারছেনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এমন অভিযোগ এলাকার মহিলাদের।

পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, বিরল উপজেলার নেহাল গ্রামে গত ২৮ অক্টোবর শনিবার রাতে সাদা পোশাকে মাদক বিরোধী অভিযান চালাতে যায় মঙ্গলপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার হাফিজুর রহমানসহ পুলিশের একটি দল। পুলিশ মাদকের সাথে জড়িতদের না পেয়ে একটি রিকশাভ্যান তুলে আনার চেষ্টা করলে গ্রামবাসী চোর সন্দেহে পুলিশের উপর হামলা চালায়। এতে আহত হন পুলিশ পরিদর্শক খন্দকার হাফিজুর রহমান ও কনস্টেবল আলতাফুর রহমান।

এই ঘটনায় গত ২৯ অক্টোবর মঙ্গলপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই তুলশী রায় বাদী হয়ে বিরল থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় ৩৫ জন আসামির নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত আসামি করা হয় ৫০/৫৬ জনকে। আসামিরা সকলেই বিরল উপজেলার ৩নং ধামইর ইউনিয়নের নেহালগ্রাম, হরিশচন্দ্রপুর এবং গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা।

রোববার থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ আতঙ্কে নেহালগ্রাম, হরিশচন্দ্রপুর এবং গোবিন্দপুর গ্রামের পুরুষরা সব পালিয়ে যায়। ফলে ওই তিন গ্রাম এখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিতে ওই তিন গ্রামে গিয়ে একজন পুরুষেরও সাথে দেখা মেলেনি। কৃষি জমিতে নেই কোনো কৃষক। নেহালগ্রাম মিলবাজারসহ আশেপাশের বাজারগুলোর সব দোকানপাট বন্ধ। নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে শুধুমাত্র নারী ও ছোট শিশুরা। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি ২/৩ দিন থেকে বাড়িতে না থাকায় অনেকের রান্নার চুলাতেও জ্বলেনি আগুন।

নেহালগ্রামের আশির্ধো বয়স্কা কানুবালা রায় জানান, তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি হচ্ছে তার একমাত্র ছেলে কৈলাশ চন্দ্র রায়। তিন দিন থেকে তার ওই ছেলে আতঙ্কে বাড়িছাড়া। তাই ঘরে যা ছিলো, তার সবটুকু খেয়ে ফেলে এখন চুলা জ্বালানোর মতো অবস্থা নেই।

একই গ্রামের সুমিত্রা রানী জানান, তার স্বামী গৌরাঙ্গ রায় পুলিশের ভয়ে পালিয়েছে। তারা ছোট শিশুদের নিয়ে রয়েছেন নিরাপত্তাহীনতায়। আতঙ্কে তার সারারাত কাটছে নির্ঘুম।
একই কথা জানালেন, ওই এলাকার অষ্টমী রায়, জোসনা রানী রায়সহ অন্যান্য নারীরাও।

জোসনা রানী রায় জানান, জমিতে তার ধান পেকে রয়েছে। বাড়ির পুরুষ মানুষটি তো নেই, সাথে পাচ্ছেন না কৃষি শ্রমিকও। ফলে সেই ধানও এখন কাটতে পারছেন না পুরুষ লোকের অভাবে।

এদিকে শুধু পুরুষরা নয়, কিশোর বয়সের ছেলেরাও পালিয়েছে এলাকা ছেড়ে। আর যেসব কিশোরী এলাকায় রয়েছেন-তারাও ভয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। ফলে এলাকার শিক্ষার্থীরা যেতে পারছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীশূন্য।

এলাকায় গিয়ে দেখা হয় পার্শ্ববর্তী উত্তর মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোসাব্বেরুল ইসলাম বাবলুর সাথে। তিনি জানান, আর একদিন পরেই জেএসসি পরীক্ষা। এই এলাকার শিক্ষার্থীরাও স্কুলে যাচ্ছে না পরীক্ষার প্রবেশপত্র আনতে। তাই তিনি একজন শিক্ষককে নিয়ে এলাকায় নিজেই এসেছেন পরীক্ষার প্রবেশপত্র দিতে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব প্রবেশপত্র দিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এলাকার এই আতঙ্কাবস্থার কথা উল্লেখ করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আনন্দ চন্দ্র রায় বলেন, পুলিশের আতঙ্কে এলাকার পুরুষরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।তিনি আরো জানান, এই তিন গ্রামে বাস করে এক হাজারেরও বেশী পরিবার। ফলে এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

ইউপি সদস্য আনন্দ চন্দ্র রায় আরো বলেন, কয়েকদিন আগেই পাশের গ্রাম কাশিডাঙ্গাসহ আশেপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি চুরি সংঘটিত হয়েছে। তাই এলাকার মানুষ ছিলো চোর-ডাকাত আতঙ্কে। আর এই চোর সন্দেহেই এলাকার আতঙ্কিত মানুষ চোর মনে করে সাদা পোশাকধারী পুলিশদের উপর আক্রমন করেছে।

তিনি জানান, সাদা পোশাকে না এসে পুলিশ পোশাক পড়ে অভিযান চালাতে আসলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না।

বিরল থানার ওসি আব্দুল মজিদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলতে না চাইলেও পুলিশের সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতেই গত শনিবার রাতে ওই এলাকায় গিয়েছিলো। কিন্তু মাদকসেবীরা গ্রামবাসীদের নিয়ে পুলিশের উপর লাঠিসোঠাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে এবং সরকারী কাজে বাধা দিয়েছে। তাদের হামলায় একজন পুলিশ পরিদর্শকসহ ২ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় মামলাও দায়ের হয়েছে।

গ্রামবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, পুলিশ তদন্ত করেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যারা দোষী নয়, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

এদিকে ৩ গ্রামবাসীর এই অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেলে বিরল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দ এলাকায় গিয়ে নারীদের খোজখবর নেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাদের আশ্বস্ত করেন, পুলিশ নিরীহ কোনো মানুষকে হয়রানী করলে তারা সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন