সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯ ০৪:০৬:২৬ পিএম

ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয় কী?

স্বাস্থ্য | সোমবার, ২৯ মে ২০১৭ | ০২:২৩:১৮ এএম

ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাসবাহিত এডিস
ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে হয়ে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো
ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয়দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বর দ্বারা
আক্রান্ত হয়ে থাকে। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা
কামড়ালে সেই মশাটি ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন
থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে থাকে।

ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরনের হয়। এক. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার। দুই. হেমোরেজিক ফিভার।

ডেঙ্গু জ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়ঃ

মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিশেষ করে
গরম এবং বর্ষার সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে সাধারণত এই
জ্বর হয় না বললেই চলে। শীতে লার্ভা অবস্থায় এই মশা অনেক দিন বেঁচে থাকতে
পারে। বর্ষার শুরুতে সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত মশা বিস্তার
লাভ করে।

সাধারণত শহর অঞ্চলে, অভিজাত এলাকায়, বড় বড়
দালান কোঠায় এই প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই ডেঙ্গু জ্বরও এই এলাকার বাসিন্দাদের
বেশি হয়। বস্তিতে বা গ্রামে বসবাসরত লোকজনের ডেঙ্গু কম হয়।

‘ডেঙ্গু ভাইরাস’(Dengue virus) চার ধরনের হয়। তাই ডেঙ্গু জ্বরও চারবার হতে
পারে। তবে যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী
সময়ে রোগটি হলে সেটি মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের
ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণঃ

ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র
জ্বর ও সেই সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জ্বর ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়।
শরীরে বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়।
এ ছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হয়। অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে
মনে হয় হাঁড় ভেঙে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ‘ব্রেক বোন ফিভার’।

জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচদিনের সময় সারা
শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়। যাকে বলা হয় স্কিন র‍্যাশ, অনেকটা
অ্যালার্জি বা ঘামাচির মতো। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব এমনকি বমি হতে পারে। রোগী
অতিরিক্ত ‘ক্লান্তিবোধ’(Wearied) করে এবং রুচি কমে যায়। কোনো কোনো রোগীর
ক্ষেত্রে এর দুই বা তিনদিন পর আবার জ্বর আসে। একে ‘বাই ফেজিক ফিভার’ বলে।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরঃ

এই অবস্থাটা সবচেয়ে জটিল। এই জ্বরে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরো যে সমস্যাগুলো হয়, সেগুলো হলো :

⇒ শরীরে বিভিন্ন অংশ
থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়। যেমন : চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে, মাড়ি ও দাঁত
থেকে, কফের সাথে, রক্ত বমি, পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা,
চোখের মধ্যে এবং চোখের বাইরে রক্ত পড়তে পারে। মেয়েদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব
অথবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে অনেকদিন পর্যন্ত রক্ত পড়তে থাকা ইত্যাদি হতে
পারে।

⇒ এই রোগের বেলায় অনেক
সময় বুকে পানি, পেটে পানি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় লিভার
আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনিতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি
জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোমঃ

ডেঙ্গু জ্বর এর ভয়াভহ রূপ হলো ডেঙ্গু শক
সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু
শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হলো :

⇒ রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।

⇒ নাড়ির স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হওয়া।

⇒ শরীরের হাত-পা ও অন্যান্য অংশ ঠান্ডা হয়ে যায়।

⇒ প্রস্রাব কমে যায়।

⇒ হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে।

⇒ এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেনঃ

ডেঙ্গু জ্বর এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা
নেই। তবে এই জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী
সাধারণ চিকিৎসা যথেষ্ট। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই
ভালো। যেমন :

⇒ শরীরের যেকোনো অংশে রক্তপাত হলে

⇒ প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে

⇒ শ্বাস কষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে

⇒ প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে

⇒ জন্ডিস দেখা দিলে

⇒ অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে

⇒ প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।

কী কী পরীক্ষা করা উচিত?

আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বর হলে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দরকার নেই, এতে অযথা অর্থের অপচয় হয়।

⇒ জ্বরের চার থেকে
পাঁচদিন পরে সিবিসি এবং প্লাটিলেট করাই যথেষ্ট। এর আগে করলে রিপোর্ট
স্বাভাবিক থাকে এবং অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। প্লাটিলেট কাউন্ট এক
লাখের কম হলে ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

⇒ ডেঙ্গু অ্যান্টিবডির
পরীক্ষা পাঁচ থেকে ছয়দিনের পর করা যেতে পারে। এই পরীক্ষা রোগ শনাক্তকরণে
সাহায্য করলেও রোগের চিকিৎসায় এর কোনো ভূমিকা নেই। এই পরীক্ষা না করলেও
কোনো সমস্যা নেই। এতে শুধু শুধু অর্থের অপচয় হয়।

⇒ প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষাগুলো যেমন এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি করা যাবে।

⇒ চিকিৎসক যদি মনে করেন
রোগী ডিআইসি জাতীয় জটিলতায় আক্রান্ত, সে ক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম,
এপিটিটি, ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা করতে পারেন।

চিকিৎসাঃ

ডেঙ্গু জ্বর দ্বারা আক্রান্ত বেশির ভাগ
রোগী সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। এমনকি
কোনো ‘চিকিৎসা’(Treatment) না করালেও। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ
নিয়েই চলতে হবে। যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। ডেঙ্গু
জ্বরটা আসলে গোলমেলে রোগ, সাধারণত লক্ষণ বুঝেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।

⇒ সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে।

⇒ যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

⇒ খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।

⇒ জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল-জাতীয় ব্যথার
ওষুধই যথেষ্ট। এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক-জাতীয় ব্যথার ওষুধ কোনোক্রমেই খাওয়া
যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।

⇒ জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।

প্রতিরোধঃ

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হলো
এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা।
মনে রাখতে হবে, এডিস একটি ভদ্র মশা, অভিজাত এলাকায়, বড় বড়, সুন্দর সুন্দর
দালান কোঠায় এরা বসবাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এরা ডিম পাড়ে।

ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের
পছন্দসই নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে
পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে
হবে।

⇒ বাড়ির আশপাশের ঝোঁপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

⇒ যেহেতু এডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে,
যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে। তাই ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোলা,
পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে।

⇒ ঘরের বাথরুমে বা কোথাও জমানো পানি পাঁচদিনের বেশি যেন
না থাকে। অ্যাকুয়ারিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না
থাকে।

⇒ এডিস মশা সাধারণত সকালে ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য
কোনো সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীরে ভালোভাবে কাপড় ঢেকে বের হতে
হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের দরজা-জানালায়
নেট লাগাতে হবে।

⇒ দিনের বেলায় মশারি টাঙ্গিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে।

⇒ বাচ্চাদের যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফ প্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে।

⇒ মশা নিধনের স্প্রে, কয়েল, ম্যাট ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে।

⇒ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে কোনো মশা কামড়াতে না পারে।

ডেঙ্গু জ্বর জীবাণুবাহী মশাটি এদেশে আগেও
ছিল, এখনো আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই একমাত্র
সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বাঁচা সম্ভব।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন